প্রবাসে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন? দেশ ছাড়ার আগে অবশ্যই জেনে নিন এই ১০ বিষয়

বিদেশে কাজের স্বপ্ন অনেক বাংলাদেশির। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা, ভালো আয় এবং উন্নত জীবনের আশায় প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ পাড়ি জমান বিভিন্ন দেশে। তবে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শুধু ভিসা ও বিমানের টিকিটের ব্যবস্থা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রয়োজন সঠিক তথ্য, বৈধ কাগজপত্র, দক্ষতা, আর্থিক প্রস্তুতি এবং গন্তব্য দেশের আইন সম্পর্কে ধারণা।
সামান্য অসতর্কতা বা ভুল সিদ্ধান্তের কারণে একজন কর্মী প্রতারণার শিকার হতে পারেন, চাকরি হারাতে পারেন, এমনকি বিদেশে গিয়ে আইনি জটিলতায়ও পড়তে পারেন। তাই বিদেশযাত্রার আগে পরিকল্পিত প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
১. আগে গন্তব্য দেশ ও কাজ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিন
বিদেশ যাওয়ার আগে ঠিক করতে হবে কোন দেশে যাবেন, কী কাজ করবেন এবং সেই কাজের জন্য আপনার যোগ্যতা আছে কি না। শুধু পরিচিত কারও কথায় বা বেশি বেতনের প্রলোভনে কোনো দেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জেনে নিন-
- গন্তব্য দেশে ওই পেশায় কর্মীর চাহিদা কেমন।
- কাজটির জন্য কী ধরনের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।
- মাসিক বেতন কত এবং বেতন কোন মুদ্রায় দেওয়া হবে।
- থাকা, খাওয়া, চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচ কে বহন করবে।
- কাজের পরিবেশ, কর্মঘণ্টা ও ছুটির নিয়ম কী।
বিদেশে যেতে মোট কত টাকা খরচ হবে এবং সেই খরচ তুলতে কত সময় লাগতে পারে।
বিদেশে যাওয়ার সম্ভাব্য আয় থেকে থাকা-খাওয়া, যাতায়াত, ঋণের কিস্তি ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে প্রকৃত সঞ্চয়ের হিসাব করতে হবে। এতে বিদেশযাত্রা আর্থিকভাবে লাভজনক হবে কি না, তা বুঝতে সুবিধা হবে।
২. পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করুন
বিদেশে কাজের জন্য যাওয়ার প্রথম ধাপ হলো বৈধ পাসপোর্ট তৈরি করা। পাসপোর্টে নাম, জন্মতারিখসহ সব তথ্য জাতীয় পরিচয়পত্র বা অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথির সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে।
প্রয়োজন অনুযায়ী প্রস্তুত রাখুন—
- বৈধ পাসপোর্ট।
- জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধনের তথ্য।
- শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ।
- পেশাগত প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার সনদ।
- প্রয়োজনীয় ছবি।
- চাকরির অফার লেটার ও চুক্তিপত্র।
- ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট বা সংশ্লিষ্ট অনুমতিপত্র।
- মেডিকেল পরীক্ষার প্রতিবেদন।
প্রয়োজনীয় ব্যাংক ও আর্থিক কাগজপত্র।
সব কাগজপত্রের কয়েকটি ফটোকপি এবং স্ক্যান করা ডিজিটাল কপি নিজের কাছে ও পরিবারের বিশ্বস্ত সদস্যের কাছে রাখুন। মূল কাগজপত্র অপরিচিত ব্যক্তি বা দালালের হাতে জমা দেবেন না।
৩. বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি ও চাকরিদাতা যাচাই করুন
বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতারণার ঝুঁকি কমাতে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও রিক্রুটিং এজেন্সি যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। কোনো এজেন্টের কথায় টাকা দেওয়ার আগে তার লাইসেন্স ও অনুমোদনের অবস্থা যাচাই করতে হবে।
বাংলাদেশ সরকারের Overseas Employment Platform (OEP)-এ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নিবন্ধন, দক্ষতা প্রশিক্ষণ, চাকরি অনুসন্ধান ও বহির্গমন ছাড়পত্রের প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। এ প্ল্যাটফর্মে রিক্রুটিং এজেন্সি ও বিদেশি নিয়োগকর্তার তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ প্রবাসীদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স বৈধ পথে আসছে না কেন?
যাচাইয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইট:
- Overseas Employment Platform (OEP)
- রিক্রুটিং এজেন্সি তথ্য ব্যবস্থা (RAIMS)
- বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস (BOESL)
বিশেষ সতর্কতা: ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে বলা হলে, রসিদ দিতে অস্বীকার করলে কিংবা দ্রুত ভিসা দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে চাপ সৃষ্টি করলে সতর্ক হোন। প্রতিটি অর্থ পরিশোধের লিখিত প্রমাণ রাখুন।
৪. চাকরির চুক্তিপত্র ভালোভাবে পড়ে বুঝে নিন
বিদেশে যাওয়ার আগে চাকরির চুক্তিপত্র যাচাই করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি। অনেক সময় কর্মীকে এক ধরনের কাজ ও বেতনের কথা বলা হলেও বিদেশে গিয়ে ভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
চুক্তিপত্রে অন্তত নিচের বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে উল্লেখ আছে কি না দেখুন-

চুক্তিপত্রের ভাষা বুঝতে সমস্যা হলে অভিজ্ঞ ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিন। ফাঁকা কাগজে স্বাক্ষর করবেন না। নিজের কাছে চুক্তিপত্রের একটি কপি রাখুন।
৫. কাজের দক্ষতা ও ভাষা শিখুন
বিদেশে ভালো বেতন ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ পাওয়ার ক্ষেত্রে দক্ষতার গুরুত্ব অনেক। শুধু বিদেশ যাওয়ার জন্য অদক্ষ অবস্থায় যাত্রা না করে আগে সংশ্লিষ্ট কাজের প্রশিক্ষণ নেওয়া উচিত।
যেমন-
- নির্মাণকাজের জন্য রাজমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান বা প্লাম্বিং প্রশিক্ষণ।
- কারখানার কাজের জন্য মেশিন পরিচালনা ও নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ।হোটেল ও রেস্তোরাঁর কাজের জন্য রান্না, সার্ভিস ও হাউসকিপিং প্রশিক্ষণ।
- গাড়ি চালানোর কাজের জন্য বৈধ ড্রাইভিং দক্ষতা ও প্রয়োজনীয় লাইসেন্স।
- কেয়ারগিভিংয়ের কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ।
একই সঙ্গে গন্তব্য দেশের ভাষার মৌলিক বিষয় শিখে নেওয়া প্রয়োজন। অন্তত নিজের পরিচয় দেওয়া, কাজের নির্দেশনা বোঝা, জরুরি সাহায্য চাওয়া এবং ঠিকানা জানাতে পারা গুরুত্বপূর্ণ।
৬. মেডিকেল পরীক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রস্তুতি নিন
বিদেশে কাজের জন্য অনেক দেশেই নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। গন্তব্য দেশের নিয়ম অনুযায়ী অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার থেকে পরীক্ষা করাতে হবে।
স্বাস্থ্য পরীক্ষার আগে-
- পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত নিয়ম জেনে নিন।
- নিজের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য গোপন করবেন না।
- নিয়মিত ওষুধ সেবন করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- প্রয়োজনীয় প্রেসক্রিপশন ও চিকিৎসার কাগজপত্র সঙ্গে রাখুন।
- গন্তব্য দেশে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিমার নিয়ম জেনে নিন।মনে রাখতে হবে, কোন কোন পরীক্ষা লাগবে তা দেশ, ভিসা ও কাজের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
৭. BMET নিবন্ধন ও বহির্গমন ছাড়পত্র নিন
বাংলাদেশ থেকে বৈধভাবে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET)-এর নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বিদেশগামী কর্মীদের নিবন্ধন, দক্ষতা ও ভাষা প্রশিক্ষণ, প্রাক্-বহির্গমন প্রশিক্ষণ, মেডিকেল পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রের ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়+1
OEP-তে দেখানো অভিবাসন প্রক্রিয়ার প্রধান ধাপগুলো হলো:
1. জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করে নিবন্ধন।
2. প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষতা প্রশিক্ষণ গ্রহণ।
3. পাসপোর্ট ও চাকরির ব্যবস্থা সম্পন্ন করা।
4. প্রাক্-বহির্গমন ওরিয়েন্টেশন বা PDO সম্পন্ন করা।
5. প্রয়োজনীয় মেডিকেল পরীক্ষা ও ভিসা প্রক্রিয়া শেষ করা।
6. বহির্গমন ছাড়পত্রের জন্য আবেদন।
7. অনুমোদিত EC Card সংগ্রহ করে বিমানবন্দরে যাত্রা করা।
বর্তমান প্রক্রিয়া ও নিজের ক্ষেত্রে কোন কাগজপত্র প্রয়োজন, তা OEP ও BMET-এর মাধ্যমে যাচাই করে নিতে হবে।
৮. বিদেশ যাওয়ার আগে আর্থিক প্রস্তুতি নিন
বিদেশে যাওয়ার জন্য অনেকেই জমি বিক্রি করেন, ঋণ নেন বা পরিবারের সঞ্চয় খরচ করেন। তাই আর্থিক পরিকল্পনা ছাড়া বিদেশযাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
যাত্রার আগে হিসাব করুন-
- পাসপোর্ট, ভিসা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের খরচ।
- প্রশিক্ষণ ও মেডিকেল পরীক্ষার খরচ।
- এজেন্সি বা নিয়োগসংক্রান্ত বৈধ খরচ।
- বিমান টিকিট ও যাতায়াত ব্যয়।
- বিদেশে প্রথম বেতন পাওয়ার আগ পর্যন্ত জরুরি খরচ।
- দেশে পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ।
প্রতিটি খরচের রসিদ সংগ্রহ করুন। ঋণ নিলে সুদ, কিস্তি ও পরিশোধের সময়সীমা বুঝে নিন। বিদেশে গিয়ে প্রথম মাসেই বড় অঙ্কের টাকা পাঠাতে হবে—এমন অবাস্তব প্রতিশ্রুতি পরিবারকে দেবেন না।
৯. প্রাক্-বহির্গমন প্রশিক্ষণে অংশ নিন
বিদেশে যাওয়ার আগে প্রাক্-বহির্গমন প্রশিক্ষণ বা Pre-Departure Orientation (PDO) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রশিক্ষণে গন্তব্য দেশের আইন, সংস্কৃতি, কর্মপরিবেশ, শ্রমিকের অধিকার, নিরাপত্তা এবং সমস্যায় পড়লে কোথায় সহায়তা পাওয়া যায়—এসব বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায়।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এ প্রশিক্ষণের কথা উল্লেখ রয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়+1
প্রশিক্ষণে শেখা বিষয়গুলো বাস্তবে কাজে লাগাতে হবে। বিশেষ করে স্থানীয় আইন, কর্মস্থলের নিরাপত্তা এবং জরুরি যোগাযোগের তথ্য মনে রাখতে হবে।
১০. বিদেশে পৌঁছানোর পর করণীয়
বিদেশে পৌঁছানোর পরও সতর্ক থাকতে হবে। বিমানবন্দর থেকে কর্মস্থলে যাওয়ার আগে নিয়োগকর্তা বা অনুমোদিত প্রতিনিধির পরিচয় নিশ্চিত করুন।
বিদেশে পৌঁছে-
- নিয়োগকর্তা ও কর্মস্থলের ঠিকানা পরিবারের কাছে পাঠান।
- বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করুন।
- স্থানীয় জরুরি সেবা ও পুলিশের নম্বর জেনে রাখুন।
- পাসপোর্ট, ভিসা ও কাজের অনুমতিপত্রের কপি সংরক্ষণ করুন।
- চুক্তির বাইরে কাজ করতে বাধ্য করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নিন।
বেতন ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রহণ ও দেশে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানোর চেষ্টা করুন।
চাকরির শর্ত, বেতন বা কর্মস্থল চুক্তির সঙ্গে না মিললে প্রমাণসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার ব্যবস্থা রয়েছে। OEP-তেও কর্মসংস্থানের তথ্য হালনাগাদ ও অভিযোগ জানানোর সুবিধার কথা উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা
প্রবাসে যাওয়া শুধু একটি দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি জমানো নয়; এটি একজন কর্মী ও তাঁর পরিবারের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত বড় সিদ্ধান্ত।
তাই আবেগ বা অন্যের কথায় তাড়াহুড়ো না করে বৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। সঠিক নিয়োগকর্তা নির্বাচন, দক্ষতা অর্জন, চুক্তিপত্র যাচাই, BMET-এর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং আর্থিক পরিকল্পনা—এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে পারলে বিদেশযাত্রার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।




২টি মন্তব্য